বাংলাদেশে ম্যান্ডেলা

আমার নাম: green tree তারিখ:- Friday, July 18, 2008

বাংলাদেশে ম্যান্ডেলা
শরিফুল ইসলাম হাসান

বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ১৯৯৭ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশে এসেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা। ম্যান্ডেলা ছাড়াও ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাত ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সুলেমান ডেমিরেল সে সময় বাংলাদেশে আসেন। এটিই ছিল ম্যান্ডেলার প্রথম বাংলাদেশ সফর। ২৬ মার্চ সকাল সাড়ে নয়টায় ম্যান্ডেলাসহ তিন রাষ্ট্রপ্রধান হেলিকপ্টারে করে স্নৃতিসৌধে পৌঁছান। পুষ্কপার্ঘ্য অর্পণের পর নেলসন ম্যান্ডেলা স্নৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে একটি বৃক্ষরোপণ করেন।
এরপর তিনি যোগ দেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তনী অনুষ্ঠানে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শুভেচ্ছা ভাষণ দেন ম্যান্ডেলা। ঐতিহাসিক এই ভাষণে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছে এমন একটি জাতিকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই আমি বাংলাদেশে এসেছি।’ ম্যান্ডেলা বলেন, ‘বাংলাদেশের একজন বন্ধু হিসেবে আমি এখানে দাঁড়িয়ে বলতে চাই, ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও অন্যান্য সমস্যার সমাধানে আমরা একসঙ্গে কাজ করব।’
২৬ মার্চ দুপুরে ম্যান্ডেলা বঙ্গভবনে রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় যোগ দেন। লিখিত বক্তব্য শেষ করে পিনপতন নিস্তব্ধতার মধ্যে সমবেত অতিথিদের সামনে ম্যান্ডেলা কিছু কথা বলেন। ম্যান্ডেলার সে কথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্িথতিতে উপস্িথত সবাইকে অনুপ্রাণিত ও মুগ্ধ করে। বর্ণবাদের অভিশাপে জর্জরিত দক্ষিণ আফ্রিকার উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে ম্যান্ডেলা কীভাবে সবাইকে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছেন তাঁর উল্লেখ ছিল এই ভাষণে।
ম্যান্ডেলা তাঁর ভাষণে বলেন, ‘আমাদের দেশে আমরা কীভাবে জাতি গঠনে মতৈক্যে পৌঁছেছি সে বিষয়টি আজ আপনাদের জানাতে চাই। আমরা আমাদের শত্রুর সঙ্গে আপস আলোচনায় বসেছি তিনটি মৌলিক নীতির ভিত্তিতে। আমরা সেই শত্রুর সঙ্গে আলোচনায় বসেছি, যারা দক্ষিণ আফ্রিকার হাজার হাজার নিরীহ বেসামরিক নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করেছে। তবে আমরা রক্তের উন্নাদনায় কোনো অশুভ শক্তির প্রতি সাড়া দিইনি। আমরা যা কিছু করেছি, দেশের স্বার্থে সাহসের সঙ্গে করেছি।’
ম্যান্ডেলা বলেন, ‘গণহত্যা এড়াতে, নিরীহ জনগণকে রক্ষায় এবং অনেক পরিবারকে খন্ডিত করা থেকে রোধের জন্যই আমরা তিনটি আদর্শ গ্রহণ করি। আলোচনার সময় আমাদের মাথায় এই ভাবনা ছিল, এই আপস আলোচনায় আমরা বা আমাদের শত্রুরা কেউ বিজয়ী হবে না, বিজয়ী হবে সমগ্র দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষ। আমরা ভেবেছিলাম, কোনো একটি রাজনৈতিক দল নয়, সমগ্র দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণকে জিততে হবে।’
ম্যান্ডেলা বলেন, ‘আমরা যে রাজনীতিতে বিশ্বাস করি ও মেনে চলি সেটি হলো সব সম্প্রদায়ের মধ্যে ভালো নারী ও পুরুষ রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ, ভারতীয়, শ্বেতাঙ্গ বা অশ্বেতাঙ্গ যার কথাই বলি না কেন, সব সম্প্রদায়ের ব্যাপারে এটি সত্য। আমরা বলতে চেয়েছিলাম, দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ভালো নারী ও পুরুষ রয়েছে।’
ম্যান্ডেলা বলেন, ‘নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর আমরা এটি ঠিক করেছিলাম, সবাই মিলে সরকার গঠন করব। আমাদের মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা ২৭ এবং দেশের তিনটি রাজনৈতিক দলের সদস্যই রয়েছেন আমাদের সরকারে।’ ম্যান্ডেলা বলেন, ‘আফ্রিকার ন্যাশনাল কংগ্রেস বিংশ শতাব্দীর স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য গর্বিত। আমরা নিঃসঙ্গ নই। আমাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমর্থন রয়েছে। কিন্তু আমরা এর অপব্যবহার করতে চাই না। এ কারণেই আমরা দেশে একদলীয় সরকার গ্রহণ করতে পারি না।’

রোবেন তীর্থ

আমার নাম: green tree তারিখ:- Friday, July 18, 2008

রোবেন তীর্থ

তীর্থযাত্রীরা সব বাস থেকে নেমে একে একে জড়ো হচ্ছে সমুদ্রপাড়ের জেটিতে। তারা যাবে ১২ মাইল দুরের এক দ্বীপে। গোটা বিশ্ব থেকে তারা এসেছে। কেউবা জাপানি, কেউ ভারতীয়, কেউ মার্কিনি, আবার কেউবা তিব্বতি। তাদের ভাষা, গায়ের রং, নাগরিকত্ব, ধর্ম সব আলাদা, কিন্তু তারা সবাই একই তীর্থের তীর্থযাত্রী, তারা সবাই একই বিশ্বাসের বিশ্বাসী। সেই বিশ্বাসের নাম মুক্তি− স্বাধীনতা। তারা সবাই মুক্তির পথযাত্রী। তারা যাবে রোবেন দ্বীপে।
তাদের মধ্যে এক বাংলাদেশিও ছিলেন। তিনি এগিয়ে যেতেই দেখলেন, সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ আঙ্গুল উঁচিয়ে কী যেন দেখাচ্ছেন। কী দেখাচ্ছেন তিনি? তাঁর তর্জনী বরাবর তাকালে চোখে পড়ল একটা মিনারের মতো। বৃদ্ধটি বললেন, ‘ওখান থেকে আমরা বন্দীদের ওপর নজর রাখতাম। কেউ পালাতে চাইলে গুলি করতাম।’ বাঙালি ভদ্রলোকটি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার দায়িত্ব কী ছিল?’ বৃদ্ধের মুখ-চোখ যেন এক স্বর্গীয় আলোয় উদ্ভাসিত হলো। বললেন, ‘আমি? আমি নেলসনের সেলের সামনে পাহারা দিতাম।’
আর এখন কী করেন?
‘এখন আমার বন্ধু নেলসন নেই, কিন্তু আমি তাঁর স্নৃতি পাহারা দিই। যারা নেলসনের বন্দী থাকার জায়গাটি দেখতে চায়, তাদের দেখাই, নেলসনের গল্প বলি।’
ইতিহাস কেবল নির্মমই নয়, মহৎ সুন্দরও বটে! যে শ্বেতাঙ্গ লোকটি শ্বেতাঙ্গদের কারাগারে এক মুক্তিকামী কালো মানুষকে পাহারা দিত, সেই মানুষটিই কিনা পরিণত হয়েছিল তার অনুসারীতে, তার ভক্ততে তার বন্ধুতে।
ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য যেমন ছিল আন্দামানের কারাগার, তেমনি দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ দখলদারির বিরুদ্ধে লড়াই করা কালো মানুষদের জন্য রোবেন দ্বীপ ছিল তেমনই এক নিষ্ঠুর বন্দিশালা। কিন্তু সেখানেই ফুটেছিল গত শতকের অন্যতম সেরা মুক্তির পুষ্কপটি। নাম তাঁর নেলসন ম্যান্ডেলা। শ্বেতাঙ্গ উপনিবেশবাদীরা তাঁর দেশে এসেছিল সভ্য করার নামে দেশটাকে ভোগ করতে। কিন্তু নেলসনের ওই কারারক্ষীই শুধু নয়, আজকে শ্বেতাঙ্গ বিশ্বে নেলসন এক মুক্তিকামী শিক্ষকের মর্যাদায় আসীন। আর রোবেন দ্বীপ সেই শিক্ষকের পাঠশালা। সেই পাঠশালায় আজ সাদা-কালো-হলুদ-বাদামি সব মানুষই আসে শিখতে ও ভালোবাসতে। কালো মানুষটিই শিখিয়েছিলেন, মনের রং সব দেশেই এক, সেখানে শাদা-কালো ভেদ নেই। ম্যান্ডেলা তাই আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মনের মানুষ।
−ফারুক ওয়াসিফ