দেব ন জানন্তি
আন্তন চেখভ
অনুবাদ: শেখ আবদুল হাকিম
তীর বেগে ছুটে চলেছে তুফান মেইল। কুউউ, কুউউ করে মাঝেমধ্যে হুইসেল বাজছে।
প্রথম শ্রেণীর রেলওয়ে ক্যারিজ। দারুণ সুন্দর এক তরুণী লাল ভেলভেটে মোড়া সিটে আধশোয়া হয়ে বসে আছে। ওর আঁটসাঁট করে বন্ধ আঙ্গুলে কাঁপছে পশমি কাপড় দিয়ে মোড়া দামি হাতপাখা; ছোট্ট, সুগঠিত নাকের ডগা থেকে বারবার খসে পড়ার উপক্রম করছে প্যাঁসনে জোড়া, সাগরে দোল খাওয়া জলযানের মতো বুকের ওপর উঁচু-নিচু হচ্ছে কারুকাজ করা ব্রোচ। আবেগে অধীর হয়ে আছে তরুণী।
উল্টো দিকের সিটে একজন তরুণ, বিশেষ কমিশনের প্রাদেশিক সচিব। তরুণ লেখকও বটে, অভিজাত শ্রেণীর বিলাসবহুল জীবন নিয়ে লেখা বড় গল্পগুলো মাঝেমধ্যে ছাপতে দেয় নামীদামি পত্রিকায়। ওর লেখার পরিণত ভাব, মুনশিয়ানা যথেষ্ট প্রশংসা পেয়েছে।
তরুণীর মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে লেখক, চোখের দৃষ্টিতে সমঝদার একজন পন্ডিতকে চেনা যাচ্ছে, একই সঙ্গে চেনা যাচ্ছে মুগ্ধ একজন স্তাবককেও। ও দেখছে, যাচাই করছে, খুঁজে নিচ্ছে বিরল এই রহস্যের প্রতিটি ছায়ার মাত্রা আর রঙের গভীরতা। উপলব্ধি করছে ও, গভীরে ডুবে তল খুঁজে নিচ্ছে। তরুণীর আত্মা, ওর সম্পুর্ণ মন আর মানসিকতা, খোলা পড়ে রয়েছে তরুণ লেখকের সামনে।
‘আপনাকে আমি বুঝতে পারছি, আপনার অস্তিত্বের গোপন গভীরতাও আমার কাছে পরিষ্ককার!’ বললেন বিশেষ কমিশনের সচিব, তরুণীর ব্রেসলেট পরা হাতে চুমো খেলো। ‘আপনার স্পর্শকাতর, মায়াভরা আত্মার মুক্তি দরকার, ওটা পালাতে চাইছে...হ্যাঁ, জানি সংগ্রামটা কঠিন, রণক্ষেত্রও বিশাল। তবে হাল ছাড়বেন না, আপনি জিতবেন! জিততে আপনাকে হবেই!’
‘আমাকে নিয়ে লিখুন, ভল্ডেমার!’ বিষণ্ন একটু হাসির সঙ্গে বলল সুন্দর তরুণী। ‘আমার জীবনে এত কিছু ঘটেছে, কী বিচিত্র আর অদ্ভুত সেসব কাহিনী, এত উত্থান আর পতন−নাহ্, কারও সঙ্গে মেলে না। সবচেয়ে বড় কথা, আমি অসুখী। আমি যেন ঠিক দস্তয়েভস্কির পাতা থেকে উঠে আসা যন্ত্রণায় কাতর কোনো আত্মা। দুনিয়াকে আমার আত্মার কথা জানান আপনি, ভল্ডেমার। ওই ভাগ্যবিড়ম্বিত, অবহেলিত আত্মাটাকে বের করে আনুন। আপনি একজন সাইকোলজিস্ট। এক ঘণ্টাও হয়নি এই ট্রেনে একসঙ্গে আছি আমরা, অথচ এরই মধ্যে আপনি আমার হূদয়ের গভীর প্রদেশে পৌঁছে গেছেন।’
‘আপনি বলুন! আপনাকে আমার ব্যাকুল অনুরোধ, আপনি বলে যান!’
‘শুনুন তা হলে। আমার বাবা সাধারণ একজন দরিদ্র কেরানি ছিলেন। মনটা ভালো ছিল, বুদ্ধিমত্তাও কম ছিল না; কিন্তু যুগের হাওয়া...চারপাশের পরিবেশ...কী বলছি বুঝতে পারছেন তো?...বেচারা বাবাকে আমি কোনো দোষ দিই না। তিনি মদ খেতেন, জুয়া খেলতেন, ঘুষ...হ্যাঁ, তাও নিতেন। আমার মা...কিন্তু এত কিছু বলার কী দরকার? অভাব, রুটি জোগাড় করার দৈনন্দিন সংগ্রাম, আমি অবাঞ্ছিত আর আমার কোনো তাৎপর্য নেই এই উপলব্ধি−না, প্লিজ, সেসব স্নরণ করতে আমাকে বাধ্য করবেন না!
‘আমাকে আমার নিজের পথ দেখে নিতে হয়েছে। আপনি তো জানেনই বোর্ডিং স্কুলের শিক্ষা কী রকম নিষ্ঠুর। আজেবাজে উপন্যাস পড়া, কৈশোর জীবনের ভুল-ভ্রান্তি, প্রথম প্রেমের ভয় জাগানো শিহরণ। সে এক বিচ্ছিরি অবস্থা! শুধুই সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা! সেই সঙ্গে জীবনের প্রতি বিশ্বাস হারানো, নিজের প্রতি আস্থা না থাকা! আপনি আমাদের, মেয়েদের চেনেন। আপনি বুঝবেন। কেননা আপনি একজন লেখক! আপনার পক্ষে হয়তো বিশ্লেষণ করা সম্ভব−আমি যে খুব শক্ত প্রকৃতির মেয়ে, এটা আমার একটা অনিষ্টকারী দিক কি না।
‘আমার ওই শক্ত প্রকৃতি সুখ খুঁজে বেড়ায়। কখনো বিরতি নেয় না, ক্লান্ত হয় না, খুঁজতেই থাকে। জিজ্ঞেস করুন সেটা কী ধরনের সুখ! আমি আমার আত্মাকে মুক্ত করে দিতে চাই! দেখতে চাই মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে যেখানে খুশি, যা খুশি করে বেড়াচ্ছে ওটা। হ্যাঁ। তাতেই আমি আমার সুখ দেখতে পাই!’
‘কী সুক্ষ্ম অনুভুতি!’ বিড়বিড় করল লেখক, সুন্দরীর হাতে আবার চুমো খেলো, এবার ব্রেসলেটের আরও কাছে। ‘এই চুমো আপনাকে নয়, খাচ্ছি দুর্দশাগ্রস্ত মানবতাকে। রাসকোলনিকভ আর তার চুমোর কথা মনে আছে আপনার?’
দস্তয়েভস্কির ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট-এ রাসকোলনিকভকে বলা হয়েছিল: ...‘রাস্তার তেমাথায় চলে যাও, মানুষের কাছে মাথা নত করো, চুমো খাও জমিনকে, কারণ ওর বিরুদ্ধেও পাপ করেছ তুমি, তারপর জোর গলায় সারা দুনিয়াকে শুনিয়ে বলো, আমি একজন খুনি।’
‘ওহ্, ভল্ডেমার! আমি খ্যাতি, সাফল্য, মর্যাদা ইত্যাদির কাঙাল, এই একটা ক্ষেত্রে আমি বাকি সবার মতোই...কোন্ দুঃখে বিনয়ী সাজতে যাব, বলুন? কেন অল্পে সন্তুষ্ট থাকার দর্শনে প্রভাবিত হব? আমার অসাধারণ কিছু দরকার, সাধারণ মেয়েরা যা কখনো আশা করতে পারে না, চাওয়ারই সাহস নেই ওদের! তারপর...ওহ্, তারপর...জীবনে চলার পথে একজনের সঙ্গে আমার দেখা হলো...’
‘কে তিনি?’ রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইল তরুণ লেখক।
‘বৃদ্ধ একজন জেনারেল, খুবই ধনী মানুষ। আমাকে বুঝতে চেষ্টা করুন, ভল্ডেমার! আমার জন্য ব্যাপারটা ছিল আত্মত্যাগ, আত্মসমর্পণ! এটা আপনাকে বুঝতে হবে! আমার আর কিছু করার ছিল না। পারিবারিক সৌভাগ্য আর সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনি আমি, যেখানে খুশি ঘুরে বেড়ানোর সামর্থ্য হয় আমার, যেকোনো ভালো কাজে হাত দিতে পারি। অথচ কীভাবেই না আমাকে ভুগতে হয়েছে! কী ঘৃণ্য, কী অপ্রীতিকরই না ছিল তাঁর ওই আলিঙ্গন...যদিও তাঁর প্রতি আমাকে বিবেচক ও ন্যায়নিষ্ঠ থাকতে হয়েছে, কারণ তাঁর সময়ে তিনি ছিলেন বীর যোদ্ধা, আত্মত্যাগী মানুষের মতো সাহসের সঙ্গে লড়াই করেছেন।
‘কী সব দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে আসতে হয়েছে আমাকে...কী রোমহর্ষক সব দুঃসময়...তবে এই আশায় বুক বেঁধে ছিলাম যে এমন দিন আসতে পারে, যখন এই বৃদ্ধ ভদ্রলোক বেঁচে থাকবেন না, আর তখন হয়তো আমি যেভাবে চাই ঠিক সেভাবে জীবন যাপন করতে পারব, নিজেকে তুলে দিতে পারব ওর হাতে, যে মানুষটিকে আমি ভালোবাসি−আমরা সুখী হব। হ্যাঁ, ওই রকম একজন মানুষ আছে, ভল্ডেমার, সত্যি আছে!’
সুন্দরী ললনা হাতপাখাটা আরও জোরে বাতাসে ঘোরাচ্ছে। ওর চেহারা কাঁদো-কাঁদো হয়ে উঠল, চোখ ভরা পানি টলটল করছে। তারপর আবার শুরু করল:
‘তারপর একদিন, অবশেষে, বৃদ্ধ জেনারেল মারা গেলেন। একথা বলব না যে আমার জন্য তিনি একেবারে কিছু রেখে গেলেন না। আকাশে ওড়া পাখির মতো মুক্ত হয়ে গেলাম আমি। এখনই তো আমার সুখী হওয়ার সময়, তাই না, ভল্ডেমার? সুখ এসে আমার জানালায় মাথা কুটছে। আমার শুধু ওটাকে ভেতরে ঢুকতে দিলেই হয়...কিন্তু...ভল্ডেমার, শুনুন! আপনাকে আমার দোহাই লাগে, শুনুন! মনের মানুষের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ার এটাই তো সেই কাঙ্ক্ষিত মুহুর্ত, তাই না? ওর জীবনসঙ্গিনী হওয়ার এই তো সুযোগ, ঠিক বলছি না? আমার কাছ থেকে প্রেরণা পাওয়ার অপেক্ষায় আছে ও, নিজ আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমার সাহায্য দরকার ওর। এটা আমাদের সুখী হওয়ার সময়, বিশ্রাম নেওয়ার সময়, জীবনটাকে পরম সুখে উপভোগ করার সময়।
‘কিন্তু ভল্ডেমার, কী অমর্যাদাকর, কী জঘন্য আর কী অর্থহীন আমাদের সবার জীবন! সবটাই কী ঘৃণ্য, ভল্ডেমার। আমি বিব্রত, আমি অসুস্থ! আমার পথে আবার একটা বাধা এসে দাঁড়াল! আবার আমি উপলব্ধি করলাম−সুখ আমার কাছ থেকে অনেক, অনেক দুরে! উফ্, কী যন্ত্রণা, কী যন্ত্রণা! আপনি যদি জানতেন, সে যে কী কষ্ট!’
‘কিন্তু কী...আপনার পথে আবার কী বাধা হয়ে দাঁড়াল? দয়া করে বলুন আমাকে! কী সেই বাধা?’
‘আরেকজন বৃদ্ধ জেনারেল, খুব ধনী...’ ভাঙা হাতপাখা ছোট্ট সুন্দর মুখটাকে লুকিয়ে রেখেছে।
তরুণ লেখকের কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ল, হাবভাবে ফুটে উঠেছে অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্টের গাম্ভীর্য আর ধ্যানমগ্নতা। ট্রেনের ইঞ্জিন হিসহিস করছে, মাঝেমধ্যে কুউউ কুউউ করে হুইসেল বাজছে, ডুবতে শুরু করা সুর্যের আভা লাগায় লালচে হয়ে উঠল জানালার পরদা।
(ঈষৎ পরিবর্তিত)
আন্তন চেখভ
রুশ সাহিত্যিক আন্তন পাভলোভিচ চেখভের জন্ন ইউক্রেনের বন্দরনগরী ট্যাগানরগে, ১৮৬০ সালে। নাটক আর আধুনিক ছোটগল্পের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিতি তাঁর। মস্কোয় মেডিসিন নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। তখনই পত্রপত্রিকায় হাস্যরসাত্মক, বিদ্রূপাত্মক গল্প লিখতে শুরু করেন। খুব দ্রুত লিখতে পারতেন, অনেক সময় একটা গল্প শেষ করতে এক ঘণ্টাও লাগত না। বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন, এসেছিলেন অখন্ড ভারতবর্ষেও। মারা যান ১৯০৪ সালের ১৫ জুলাই, জার্মানিতে।