রোবেন তীর্থ

আমার নাম: green tree তারিখ:- Friday, July 18, 2008

রোবেন তীর্থ

তীর্থযাত্রীরা সব বাস থেকে নেমে একে একে জড়ো হচ্ছে সমুদ্রপাড়ের জেটিতে। তারা যাবে ১২ মাইল দুরের এক দ্বীপে। গোটা বিশ্ব থেকে তারা এসেছে। কেউবা জাপানি, কেউ ভারতীয়, কেউ মার্কিনি, আবার কেউবা তিব্বতি। তাদের ভাষা, গায়ের রং, নাগরিকত্ব, ধর্ম সব আলাদা, কিন্তু তারা সবাই একই তীর্থের তীর্থযাত্রী, তারা সবাই একই বিশ্বাসের বিশ্বাসী। সেই বিশ্বাসের নাম মুক্তি− স্বাধীনতা। তারা সবাই মুক্তির পথযাত্রী। তারা যাবে রোবেন দ্বীপে।
তাদের মধ্যে এক বাংলাদেশিও ছিলেন। তিনি এগিয়ে যেতেই দেখলেন, সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ আঙ্গুল উঁচিয়ে কী যেন দেখাচ্ছেন। কী দেখাচ্ছেন তিনি? তাঁর তর্জনী বরাবর তাকালে চোখে পড়ল একটা মিনারের মতো। বৃদ্ধটি বললেন, ‘ওখান থেকে আমরা বন্দীদের ওপর নজর রাখতাম। কেউ পালাতে চাইলে গুলি করতাম।’ বাঙালি ভদ্রলোকটি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার দায়িত্ব কী ছিল?’ বৃদ্ধের মুখ-চোখ যেন এক স্বর্গীয় আলোয় উদ্ভাসিত হলো। বললেন, ‘আমি? আমি নেলসনের সেলের সামনে পাহারা দিতাম।’
আর এখন কী করেন?
‘এখন আমার বন্ধু নেলসন নেই, কিন্তু আমি তাঁর স্নৃতি পাহারা দিই। যারা নেলসনের বন্দী থাকার জায়গাটি দেখতে চায়, তাদের দেখাই, নেলসনের গল্প বলি।’
ইতিহাস কেবল নির্মমই নয়, মহৎ সুন্দরও বটে! যে শ্বেতাঙ্গ লোকটি শ্বেতাঙ্গদের কারাগারে এক মুক্তিকামী কালো মানুষকে পাহারা দিত, সেই মানুষটিই কিনা পরিণত হয়েছিল তার অনুসারীতে, তার ভক্ততে তার বন্ধুতে।
ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য যেমন ছিল আন্দামানের কারাগার, তেমনি দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ দখলদারির বিরুদ্ধে লড়াই করা কালো মানুষদের জন্য রোবেন দ্বীপ ছিল তেমনই এক নিষ্ঠুর বন্দিশালা। কিন্তু সেখানেই ফুটেছিল গত শতকের অন্যতম সেরা মুক্তির পুষ্কপটি। নাম তাঁর নেলসন ম্যান্ডেলা। শ্বেতাঙ্গ উপনিবেশবাদীরা তাঁর দেশে এসেছিল সভ্য করার নামে দেশটাকে ভোগ করতে। কিন্তু নেলসনের ওই কারারক্ষীই শুধু নয়, আজকে শ্বেতাঙ্গ বিশ্বে নেলসন এক মুক্তিকামী শিক্ষকের মর্যাদায় আসীন। আর রোবেন দ্বীপ সেই শিক্ষকের পাঠশালা। সেই পাঠশালায় আজ সাদা-কালো-হলুদ-বাদামি সব মানুষই আসে শিখতে ও ভালোবাসতে। কালো মানুষটিই শিখিয়েছিলেন, মনের রং সব দেশেই এক, সেখানে শাদা-কালো ভেদ নেই। ম্যান্ডেলা তাই আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মনের মানুষ।
−ফারুক ওয়াসিফ

0 শত মন্তব্য। হা! হা!: